হুল উৎসব থেকে তির-ধনুক নিয়ে হামলা, তিরবিদ্ধ উপ-প্রধানের ভাই, শালবনি কোবরা ক্যাম্পে জওয়ানের আত্মহত্যা, করোনায় মৃতদের পরিবারকে দিতে হবে ক্ষতিপূরণ, কেন্দ্রকে নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের, কসবা কাণ্ডে অভিযুক্ত দেবাঞ্জন দেবকে মনোরোগী বলে দাবি করলেন আইনজীবী, বালি তোলা সহ নানা সমস্যার সমাধান করতে হবে বৈঠকে বললেন মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া, পরিত্যক্ত পিপিই কিট পরে শহরের রাস্তায় ঘুরছে মানসিক ভারসাম্যহীন, আতঙ্ক মেদিনীপুরে, জনপ্রিয় অভিনেতা বর্তমানে মাছ ব্যবসায়ী, হলফনামা জমা দেবার ক্ষেত্রে জরিমানা দিতে হল পাঁচ হাজার টাকা, আজ ঘোষণা হতে পারে নারদ মামলার রায়, বুধবার থেকে পনেরো শতাংশ ভাড়া বাড়ছে ওলা উবেরের,

Latest Trending Online News Portal : Bongobani.com

Sports News District News National News Updates

সাহিত্য ও বিনোদন

লোকটা

সৌরদীপ

১.
লোকটাকে মাঝেমাঝেই দেখতে পান অলকা… বিশেষ করে যখন তাঁর কন্যা পৌলমী সামনে থাকে! নির্বিকার, নৈর্ব্যক্তিক একটা মুখ তার.! অথচ হয়তো তখন জন্মদিনের পার্টিতে কেক কাটা হচ্ছে, হাততালির বন্যায় ভেসে যাচ্ছে ঘর। অথবা তাঁর শিশুকন্যাটি ঘুমাচ্ছে, অলকা দেখতে পেলেন, লোকটা তার বিছানার উপর থেকে ঝুঁকে পড়ে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। টেরিকাটা চুল, জোড়া ভুরু, একটা পাতলা গোঁফ তার, গায়ের রং চাপা। বয়েস, এই পঁচিশছাব্বিশ।
সুজয়কে কথাটা বহুবার বলেছেন অলকা। প্রথমবার দেখেই বলেছিলেন। তখন পৌলমীর বয়েস ৮ মাস। মেয়েকে কটে শুইয়ে একটু বাইরে গেছেন, হঠাৎ মেয়ের গলার খিলখিল হাসি শুনে দৌড়ে এলেন। এসে দেখেন, একটা অচেনা লোক মেয়ের খাটের পাশে দাঁড়িয়ে কেমন একটা মুখভঙ্গী করছে। দেখে তো ভয় পেয়ে চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় করে তুলেছেন, সুজয় পাশের ঘর থেকে ছুটে আসতে আসতে লোকটা কোথায় যেন চলে গেল।
তারপর থেকে প্রতিবার এরকম। প্রথম একবার-দুবার সুজয় বিশ্বাস করেছিল ব্যাপারটা, আজকাল হ্যালুসিনেশান বলে কাটিয়ে দেয়। অলকা বুঝতে পারে সে তাকে পাগল ভাবে। যেন লোকটা তার আর সুজয়ের সম্পর্কের মাঝখানে দেওয়াল হয়ে উঠছে দিনে দিনে। সে আর বলেও না কাউকে কিছু। কারণ সেই একমাত্র দেখেছে লোকটাকে, সেই একমাত্র দেখতে পায়। লোকটাও কিছু করে না। আসে, কেমন করে যেন চেয়ে থাকে, তারপর নিজেই ফিরে যায়। ভয় না, তবে প্রতিবারই একটা হাড় হিম করা স্রোত নেমে আসে অলকার শিরদাঁড়া বেয়ে।

২.
এদিকে পৌলমী বড় হচ্ছে, হাতে পায়ে দুরন্ত। স্কুলের মাঠে ক্লাসের ছেলেদের সাথে মারপিট করে বাড়ি আসে সে। সুজয় বকাবকি করেন না। বাপের সাথে মেয়ের অদ্ভুত সখ্য। অলকা বকা দেন, সুজয়ের সাথে ঝগড়া করেন। বলেন, ” তোমার আস্কারাতেই তোমার মেয়েটা গোল্লায় যাবে।” সুজয় কিন্তু মুচকি হাসেন। কারণ, যতই ডানপিটে হোক, মেয়ে কিন্তু পড়াশোনায় খুব ভালো। তবে, সেই লোকটারও আসা কিন্তু কমে গেছে। অন্তত অলকার তাই ধারনা। যদিও সম্পূর্ণ যে বন্ধ হয়েছে তা নয়। তাই রাতের দিকে মেয়ের ঘরে আলো জ্বললে এখনও অলকা দৌড়ে যান। মেয়ের ঘর থেকে গুনগুন করে গান তার কানে পৌঁছায়। ব্যারিটোন ভয়েস। “ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনি ফির কঁহা…” অলকা ঘরে ঢোকেন। তন্নতন্ন করে খোঁজেন বিছানা। উঁকি মেরে দেখেন খাটের তলা, আলমারির ভিতর, জানালার বাইরে। মেয়ে হাসে। বলে, “কেউ তোমার মেয়েকে ধরে নিয়ে যাবে না মাম।” অলকার শান্তি হয়না তাও। তিনি প্রতিটি অপসৃয়মান ছায়া, প্রতিটি ভুল দেখার মধ্যে তাকে খুঁজে চলেন। মিথ্যার মধ্যে যেমন করে সত্যি খুঁজতে হয়।

৩.
ডাক্তারবদ্যি কম দেখাননি অলকা। সাধুসন্ত ফকির রোজা কাউকে বাদ রাখেননি। ডাক্তার হ্যালুসিনেশনের ওষুধ দিয়েছে। তাতে ঘুমঘুম গন্ধ। সে ওষুধ খেয়েও লোকটার উপস্থিতি টের পেয়েছেন অলকা। বন্ধ করে দিয়েছেন ওষুধ, ফিরে যাননি ডাক্তারের কাছে। ভূত তাড়ানোর জন্য ওঝার পিছনে হাজার হাজার টাকা বেরিয়ে গেছে। পরের দিন গিয়ে দেখেছেন আখড়া ফাঁকা, সেখানে একপাল ছাগল চরাতে এসেছে কোনো রাখাল। তারপর একটা ব্যাপার হয়েছে, অলকা বুঝেছেন, লোকটা মেয়ের কোনো ক্ষতি হতে দেয় না, অন্যকারো ব্যাপারেও তার কোনো আগ্রহই নেই। ভূত হোক বা অন্যকিছু, তাতে খুশীই হয়েছেন। রাস্তাঘাটের যে অবস্থা…

৪.
অপরাধবোধ? নাহ। জীবনে কারো ক্ষতি করেননি অলকা, তবে কেন এমন হল? ভাবছিলেন… সুজয় নেই হয়ে গেছে বছরদুয়েক, পৌলমী আমেরিকায় চাকরি করে। কী যে হল মেয়েটার, ফেরত আসার বা বিয়ের নাম করলেই কেমন একটা তড়িঘড়ি ফোন কেটে দেয়। মেয়ের রুমমেট ওই লিজা নামের মেয়েটা বড় ভালো। তার সাথে কত গল্প করে, রেসিপি শিখে নেয়, কেমন মিষ্টি করে কথা বলে… পৌলমী সেখানে যেন কেমন কাঠকাঠ। আচ্ছা, তার বাবার মত পৌলমী তাঁকে পাগল ভাবে? তাই বোধহয় পাগল মায়ের মুখ দেখতে ইচ্ছা করে না তার। সেদিন তো ওই লিজার সাথে কথা বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন তিনি। এদিকে মেয়ে চলে যাবার পর থেকেই সে লোকটার দেখা পাননি তিনি। লিজা পেয়েছে? জিজ্ঞেস করে দেখবেন মেয়েটাকে একদিন। ভারী ভালো মেয়ে। গভীর নিশ্বাস ছাড়েন তিনি।

৫.
ধন্যি বটে ওই লিজা, মেয়েটাকে তো আসতে রাজি করিয়ে ফেলল। তিনি শুনেই বলেছিলেন, তুমিও এসো। আজ সেই দিন, সকাল থেকে তিনবার পরিষ্কার করিয়েছেন পৌলমীর ঘর। তার সাথে গেস্টরুমটাও। বেল বেজে উঠল, পড়ি কী মরি করে দরজা খুললেন অলকা… সামনে একটা ছোটোখাটো সোনালি চুলের মেয়ে, আর পিছনে, মাথাটা ঘুরে গেল অলকার… সেই লোকটা… সরু গোঁফ, জোড়াভুরু, টেরিকাটা চুল, শ্যামলা রঙ আর দোহারা চেহারা নিয়ে জলজ্যান্ত হ্যালুসিনেশন এসে দাঁড়িয়েছে সামনে।

৬.
কাঁদছিলেন অলকা, সেই লোকটা নাকি পৌলমীই, ছোটোবেলা থেকেই সে নিজেকে ছেলে ভাবে। বাড়ির ভয়ে, সমাজের ভয়ে চেপে রাখত সব৷ আমেরিকায় গিয়ে লিজার প্রেমে পড়ল, তারপর শরীরটাকে সঠিক করিয়ে নিচ্ছিল একটু একটু করে। ভেবেছিল আর কক্ষনও ফিরবে না। লিজাই বুঝিয়ে এনেছে। ও হ্যাঁ এখন তার নাম পৌলমী নয়, পল্লব!

৭.
মেনে না নিয়ে উপায় কী? ফেরার সময় লোকটার মাথায় হাত বুলিয়ে  অলকা বলেছিলেন, “তাড়াতাড়ি আবার আসিস।” পৌ থুড়ি পল্লবও ভাবেনি ব্যাপারটা এত সহজে মিটবে। ধরা গলায় বলল, “আসব”। প্রথমবার লোকটার ভিজে যাওয়া চোখ আর হাসি দেখলেন অলকা।

৮.
পিছন ফিরে বুড়ির ছোট হতে থাকা অবয়বটা দেখছিল লিজা। সে একটা অদ্ভূত জিনিস দেখেছে। বুড়ির আশেপাশে একটা রোগামত মেয়ে ঘুরে বেড়ায়। চাপা রঙ, জোড়া ভুরু। বয়েস? এই ১০-১১ হবে!

জানাশোনা : পেশায় ডাক্তার। নেশা কবিতা, গল্প, আড্ডা। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “আয়নায়”।

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *