Latest Trending Online News Portal : Bongobani.com

Sports News District News National News Updates

সাহিত্য ও বিনোদন

বন্ধন

শৈবাল মুখোপাধ্যায়

বিছানার একপাশে চায়ের কাপটা তখনও পড়ে আছে। তাতে আধ খাওয়া লিকার চা। দু একটা মাছি ওড়াউড়ি করছে। কোনও দিকে খেয়াল নেই বিশ্বনাথবাবুর। জ্বরের জন্য বুক ঢাকা চাদরে চুপচাপ শুয়ে আছেন। মাথার উপর হাল্কা ভাবে ঘুরছে সিলিং ফ্যানটা। কখনও ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে কখনও গরম। ঠান্ডা লাগলে চাদরটা টেনে নিচ্ছেন। গরম লাগলে ফেলে দিচ্ছেন।
সেই সকালেই একবার এসেছিল প্রভাবতী। জ্বর মেপে চা দিয়ে চলে গিয়েছে। তার পর থেকে একবারের জন্যও এই ঘরে আসতে পারে নি। সকাল হলেই রান্নাঘরে যুদ্ধকালীন তৎপড়তায় এক অসীম যুদ্ধ চলে। পেটের জন্য। যার জন্য প্রতিটি মানুষকেই কাজে বের হতে হয়। এখন তিনি পুরোপুরি বেকার। মানে চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করে ঘরেই বসে আছেন। তাও প্রায় আজ সতের আঠের বছর হল। বিছানায় শুয়ে শুয়েই তিনি সব বুঝতে পারছেন।


এক একটা সকাল মানেই নতুন করে পথ চলা শুরু। এক একটা চলে যাওয়া দিন মানেই সেটা অতীত। আর অতীতের ভুল সংশোধন করা যায় না। ফলে বর্তমানকে বুকে আঁকড়ে পথ চলতে হয়। খুব সাবধানে পা ফেলতে হয়। ভুলের পুনারাবৃত্তি করা চলবে না। আটাত্তুরে বিশ্বনাথবাবুর এইসব কথা মনে পড়ছে কেন? তিনি কী সত্যিই কিছু ভুল করেছেন? কই সে রকম তো কিছু মনে করতে পারছেন না। তাহলে এসব কথা ওনার মনে আসছে কেন? এটা কি জ্বরের বিকার।
তুমি কি আমাকে ডাকলে? রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলেন প্রভাবতী। এসে দেখলেন বিশ্বনাথবাবু তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। মুখে কোনও কথা নেই। অথচ প্রভাবতী যেন শুনতে পেলেন উনি ডাকছেন।– কি হল? ওইভাবে তাকিয়ে কী দেখছ?
বিশ্বনাথবাবু খুব ধীরে ধীরে বললেন– তোমাকে। প্রভাবতী সেকথার কোনোও উত্তর না দিয়ে একবার জ্বর মেপে নিলেন। নাহ, একটু কমেছে।
— আমার কাছে একটু বসবে প্রভা।
— আমার কী এখন বসার সময় আছে। এখনও ছেলেরা আপিসে বের হয়নি। ওদের দিকটা একটু ব্যবস্থা করে আমি আসছি। এই বলে প্রভাবতী চলে গেলেন। 
বিশ্বনাথবাবু তাকে ডাকেন নি। কিন্তু ওনার মনে হচ্ছিল প্রভা যেন ওনার সামনে বসে থাকে। ওনার মনের ভাবনাটাই কী প্রভার কানে গিয়েছিল। একে কি যেন বলে। মন থেকে ডাকলে সে শুনতে পায়। জীবনে আর কখনও কি এইরকম ঘটেছিল? কে জানে। মনে পড়ছে না। ঘরে একটা বাসন পড়তেই চিন্তাচ্ছেদ ঘটল বিশ্বনাথবাবুর।

আজ কত বছর হল একা হাতে এই সংসারটাকে সামলে চলেছে প্রভা। সে তো আজকে আসে নি এই ঘরে। যদিও অনেক দেরিতে বিয়ে হয়েছে বিশ্বনাথবাবুর। ওঁর বাবা একটা সওদাগরি আপিসে কাজ করতেন। খুব তাড়াতাড়ি মারা যেতেই সংসারের সব দায় দায়িত্ব চলে আসে ওনার কাঁধে। বিধবা মা আর ওনারা তিন জন। এর মধ্যে দু’টো অবিবাহিত বোন। সকাল বিকাল টিউশনি মাঝে স্কুল। এই ভাবে কোনও রকমে একার চেষ্টায় পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু চাকরি? চাকরি না করলে কীভাবে সংসার চলবে। তাই টাইপ স্কুলে ভরতি হলেন। একাগ্রচিত্তে আট মাসের মাথায় টাইপে স্পিড তুললেন তিরিশ। তাকেই সম্বল করে বিভিন্ন স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে লাগলেন। অবশেষে ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। মেমারিতে একটা স্কুলে ক্লার্কের চাকরি পেলেন। এর মধ্যে দুই বোনও এটা ওটা করে সংসারের কিছু দায়িত্ব নিল। বোনেদের ভাল পাত্র দেখে বিয়ে দিতেই মা চলে গেলেন। তখন একা। নিজের জন্য আর অন্য কিছু ভাববার দরকার পড়ত না। একা খেয়ে দেয়ে চাকরি করে দিব্যি চলে যাচ্ছিল। কিন্তু বোন ভগ্নিপতি এরা মানবে কেন। তারা উঠে পড়ে লাগল। তারাই পছন্দ করল প্রভাবতীকে। বিশ্বনাথবাবু কোনও আপত্তি করেন নি।

প্রভা এসে সংসারের হাল ধরল। সকালে উঠে স্নান সেরে ধোয়া কাপড় পরে রান্নাঘরে যেত। সকালের চা থেকে শুরু করে রান্নাবান্না, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘরদোর সামলে রাখা- সব একা হাতে। কখনও কোনও কাজ করতে দেয় নি বিশ্বনাথবাবুকে। ওনার ছিল শুধুমাত্র বাজার করা। তাও প্রভা বলে দিত। আজও মনে পড়ে, নিজে থেকে কখনও কোনও কিছু বোধহয় কিনে আনেন নি। আসলে বিশ্বনাথবাবু না ছিলেন বৈষয়িক না ছিলেন ঘোরতর সংসারি। ফলে প্রভা যা পেরেছে উনি পারতেন না। সেটা বুঝে গিয়েছিলেন বিয়ের একমাসের মধ্যেই। তাই বিয়ের পরের মাসের মাস মাহিনা এনে প্রভার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
— তুমি আমাকে দিচ্ছ কেন? সংসার তুমি চালাবে তোমার কাছেই রাখ।
— না প্রভা। সংসার তোমার। একটা ঘর বাঁধে পুরুষ আর সংসার গড়ে নারী। তাই আজ থেকে সংসারের সব দায় দায়িত্ব তোমার। আর আমি খুব ভাল করেই জানি তুমি ঠিক পারবে। বিয়ের আগে আমাদের সংসারের দায়িত্ব ছিল ছোট বোনের উপর। আমি কাজ করেছি আর টাকা এনে তুলে দিয়েছি ওঁর হাতে।সেই প্রভা। আজও সমান দায়িত্ব নিয়ে ঘর সংসার সামলে চলেছে। ছেলে মেয়েদের মানুষ করা থেকে শুরু করে যা করার সবটাই করেছে প্রভা। ওঁর হাতেই ছেলে মেয়েগুলো মানুষ হল। ছেলেমেয়েদের দিকে কোনও দিন তাকান নি বিশ্বনাথবাবু। ওঁরা কোন ক্লাসে পড়ছে সেটাও অনেকসময় ঠিক মতো বলতে পারেন নি। আজ ছেলেমেয়েরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে প্রভাংশু ডাবলিউ বি সি এস অফিসার। ছোট ছেলে দেবাংশু ব্যাঙ্কে চাকরি করে। একমাত্র মেয়ে স্কুল শিক্ষিকা। তাঁর স্বামী দেবরাজ প্রফেসর। বড় পুত্রবধু শিক্ষিকা। এই এক জীবনে আর কী চাই। তিনি এদিক থেকে সুখি। পাড়ার অনেকে বলেন আপনি তো মশাই ভাগ্যবান। সব কটা ছেলেমেয়ে আজ দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এরকম ক’জন পায় বলুন তো?গর্ব হয় বইকি। বাবা হিসেবে বেশ গর্ব হয় বিশ্বনাথবাবুর। তিনি ঘরে এসে প্রভাকে কাছে বসিয়ে বলেন
— জানো প্রভা, আজ আমাকে সবাই খাতির করে। দোকানে গেলে আগে ছেড়ে দেয়। হাটে বাজারে পাড়ার লোকের সঙ্গে দেখা হলে হেসে কথা বলে। ছেলেমেয়েদের খবর জানতে চায়।প্রভা ঠোটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলে- এ তো ভাল কথা। তোমার এই কথা শুনে গর্ব করা উচিত। তুমি ভাগ্যবান।
— না গো আমাকে ভাগ্যবান বোল না। আমি জানি আমার সংসার দাঁড় করিয়েছে একজন ভাগ্যবতী। আগে কেউ ডেকে কথা পর্যন্ত বলতো না। পাড়ার পুজো মন্ডপে গেলে কেউ একটা চেয়ার এনে দিত না বসবার জন্য। সাধারণ একটা স্কুল কেরানি। কোনও দিন কারও সঙ্গে তেমন মেলামেশাও করিনি। সাধারণ জীবন ধারণ করে গেলাম। না, না, এতে আমার কোনও কষ্ট নেই। কোনও রাগ অভিমানও নেই। কিচ্ছু না। সবাই তো সমান হয় না প্রভা। আমি চিরকালই সহজ সরল একজন সাধারণ মানুষ। খেয়ে দেয়ে স্কুলের কাজ ছাড়া আর তো কিছুই করলাম না।
প্রভা বোধহয় এতক্ষণে ছাড় পেল। একটু আগে দুই ছেলে আর বৌমা বেরিয়ে গেল। ওরা তিনজনেই প্রায় একই সময় বের হয়। আপিস যাওয়ার আগে প্রভাংশু বিশ্বনাথবাবুর মাথার কাছে এসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
— ওষুধ খেয়েছ?
— হ্যাঁ।
— মনে হচ্ছে আগের থেকে জ্বরটা অনেক কম। সাবধানে থেকো। আমরা আসছি।
— হ্যাঁ এসো। তোমরাও সাবধানে যেও।
এই ছেলেমেয়েদের জ্বর জ্বালা যা কিছু হয়েছে সব একাই সামলিয়েছে প্রভা। বিশ্বনাথবাবু কিছু করেন নি। আসলে উনি খুব ভয় পান। একবার দেবাংশুর হাত ভেঙে গিয়েছিল। উনি তখন স্কুলে। স্কুল থেকে ফিরে যেই দেখলেন ছেলের হাত ভাঙা ঠিক করলেন পরদিন থেকে স্কুল যাবেন না। ছুটি নিয়ে ঘরে বসে থাকবেন। ছেলেকে বিছানা থেকে উঠতে দেবেন না। প্রভা এসে বলল “ও নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। এখন মাসের শেষ। তোমাকে স্কুল টিচারদের মাইনেপত্রর হিসাব নিকাশ করতে হবে। তুমি স্কুলে যাও। আমি দেখব”।
আর একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন ট্রেনে। রসুলপুরে ট্রেন থামতেই উনি জানালার কাছে এসে বসলেন। আর বসতেই ডাউন লাইনে একটা মৃত দেহ পড়ে থাকতে দেখে ওনার গা গুলিয়ে উঠল। বমি করে দিলেন। সহযাত্রীরা জল দিয়ে ওনাকে সুস্থ করে তুললেন। তার পর থেকে উনি জানালার ধারে বসতেন না। বহুদিন সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়ে ওনার গা গুলিয়ে গুলিয়ে উঠছিল।প্রভা এক বাটি সাবু এনে বলল
– আস্তে আস্তে উঠে বসো। সাবুটা খেয়ে নাও।এই এক লোক। জ্বর জ্বালা হলে মুখে কোনও কথা নেই। চুপচাপ মরার মতো পড়ে থাকে। খেতে দিলে খাবে, না দিলে খাবে না। শুধু শুয়ে থাকা। একটু উঠে বসতে তো পার।বিশ্বনাথবাবু বিছানায় উঠে সাবুটুকু চুমুক দিয়ে খেয়ে নিলেন।প্রভা বাটি নিয়ে উঠতেই বিশ্বনাথবাবু প্রভার হাত ধরে বললেন
— একটু বসো।
— আমার কী এখন বসবার সময়। ওদিকে কত কাজ পড়ে আছে। ছেলেরা সব আপিস চলে গেল। ওদের এঁটো বাসন কোসন পড়ে আছে।
— বুঝলে প্রভা, আমি যত তোমাকে দেখি ততই অবাক হয়ে যাই। একে হাতে পুরো সংসারটাকে সামলে নিলে। বিনিময়ে আমি তোমাকে কতটুকু সুখ শান্তি দিতে পারলাম কে জানে। সংসারের জন্য তোমার রূপ যৌবন সব চলে গেল। সেই চেহারা আর নেই। দেখতে দেখতে চোখের সামনে তুমি বুড়ি হয়ে গেলে। আমি জানি তুমি আমার ঘরে এসে কিছুই পেলে না। এটা তোমার দুর্ভাগ্য। কিন্তু আমি তোমাকে পেয়ে অনেক কিছু পেলাম। কে যেন বলেছিল
– মেয়েরা শুধু সাজতেই পারে না তারা সাজাতেও জানে। সত্যিই তাই। তুমি ছাড়া এই ঘর অসম্পূর্ণ থেকে যেত। একটু হাপ ধরে গেল কী বিশ্বনাথবাবুর। বোধহয়।একটু থেমে উনি আবার বলতে শুরু করলেন
— প্রভা তোমার মনে আছে সেই প্রথম দিনের কথা। তোমাকে নিয়ে ঘরে এসে আমাদের ইষ্ট দেবতার কাছে প্রণাম করে বলেছিলাম-“দেখ, কাকে এনেছি। আমার বৌ। প্রভাবতী। তুমি আমাদের আশীর্বাদ কর আমরা যেন সুখে দুঃখে একে অপরের পাশে থেকে সারাজীবন চলতে পারি”। মনে আছে তোমার?
এসব কথা শুনতে শুনতে প্রভার চোখের কোল ভিজে উঠল। শাড়ির আঁচলে সেটুকু মুছে বলল-
– আজ হঠাৎ এই সব কথা কেন। তুমিই তো আমার সব। আর কে বলেছে আমি তোমার কাছ থেকে কিছু পাই নি। একজন নারী একজন পুরুষের কাছে ভালবাসা চায়। পুরুষটি তার মন বুঝবে। দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া থাকবে। আমি তো সব পেয়েছি। ছেলে পেয়েছি, মেয়ে পেয়েছি। তাদের নিজের হাতে লালন পালন করেছি। বড় হয়ে তারা তোমার মুখ উজ্জ্বল করেছে। মেয়েকে বিপথে যেতে দিই নি। আমার মতো সুখি ক’জন আছে বল তো। আজ আমার বাবা মা বেঁচে থেকে যদি দেখে যেত তাহলে তারা স্বর্গে গিয়েও সুখি হত।
— জান, আমি ক’দিন ধরেই এসব কথা ভাবছিলাম। ভাবছিলাম আমি যেন জন্ম জন্মান্তরে তোমাকেই স্ত্রী হিসেবে পাই। আমার মতো ঠান্ডা নিরীহ লোকের তোমার মতো স্ত্রীর দরকার। এই জীবনটা যেমন তেমন ভাবে কেটে গেল। যদি পরজন্মে আবার আমরা একসঙ্গে হই তাহলে তোমাকে আরও ভাল রাখবার চেষ্টা করব।

প্রভা বিশ্বনাথবাবুর কপালে হাত দিয়ে দেখল জ্বরটা আবার বেড়েছে। সাবু খাওয়ার পর একটা ওষুধ আছে। সেটা খাইয়ে বলল
— তুমি একটু চুপ করে শোও। আমি মাথায় জল পট্টি দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে উঠে দাঁড়াতেই বিশ্বনাথবাবু বললেন
– আর একটু বস। আজ তোমার সঙ্গে কথা বলতে খুব ভাল লাগছে। জানি না এটাই শেষ কথা কিনা। শেষের কথাগুলো আর বলতে পারলেন না। প্রভা উঠে চলে গেল।
প্রভা রান্না ঘরে গিয়ে দেখল বেড়ালটা কখন যেন ঢুকে পড়েছে। এঁটোকাঁটা যা ছিল সব খেয়ে গিয়েছে। এখন এগুলো পরিষ্কার না করলেই নয়। এসব ভাবতে ভাবতে প্রভা রান্নাঘর পরিষ্কার করে বাসন মেজে যখন ঘরে এল, দেখল বিশ্বনাথবাবুর মাথা বালিশের বাইরে কাত হয়ে আছে। প্রভা তাড়াতাড়ি করে মাথাটা তুলে ধরতেই চমকে উঠল। শুধু তাই নয়, সে যা বোঝার বুঝে গেল। বুকটা হু হু করে উঠলেও নিজেকে শক্ত করে সে ফোন করল বড় ছেলেকে।

জানাশোনা : বর্ধমান শহরে বাস। সাদামাটা হাস্যোজ্জ্বল মানুষ। অনেক বছর ধরে নানান পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছেন । একমাত্র গল্পের বই “স্বপ্ন সন্ধান”। ২০১৭ তে পেয়েছেন  ‘চিত্ত ভট্টাচার্য্য স্মৃতি অভিযান সাহিত্য সম্মান’।

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *