Latest Trending Online News Portal : Bongobani.com

Sports News District News National News Updates

দেশ

নয়া বিতর্কের নাম সেন্ট্রাল ভিস্টা !

মধুরিমা সামন্ত

চারদিকে যখন খবরের কাগজ টিভির পর্দা আমাদের মাথার সবকিছু ভরে গেছে করোনা,  টিকা , অক্সিজেন , রেমিডিসিভির এই শব্দগুলোতে ঠিক তখনই আমাদের একঘেয়েমি  কাটাতে নমো সরকার নিয়ে এলো এক টাটকা বিতর্ক। ‘ সেন্ট্রাল  ভিস্টা প্রকল্প ‘।  ২০ হাজার কোটির সেন্ট্রাল ভিস্টা রিকন্সট্রাকশন প্রকল্প। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ইন্ডিয়া গেট এই তিন কিলোমিটার রাস্তাকে বলা হয় সেন্ট্রাল ভিস্টা। যার মধ্যে আছে সাউথ ব্লক , নর্থ ব্লক , পার্লামেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলি।

কেন্দ্রীয় সরকার সিন্ধান্ত নিয়েছে এই সম্পূর্ণ সেন্ট্রাল ভিস্টা রিকন্সট্রাকশনের। আসলে বলা যায় যা হতে চলেছে নেতা মন্ত্রী আমলাদের জন্য এক সুবিশাল চোখ ধাঁধানো কমপ্লেক্স। এবং তার মোট খরচ কুড়ি হাজার কোটি টাকা যা বিরোধীদের এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কুড়ি হাজার কোটি টাকায় কি কি হতে পারতো তা জানলে হয়তো বিরোধীদের বিরোধিতার যুক্তি বুঝতে সুবিধা হবে। দিল্লিতে একটি হসপিটাল তৈরি করতে খরচ মোটামুটি ১৫০ কোটি টাকা অর্থাৎ এই টাকায় প্রায় ১৩০ টির কাছাকাছি হাসপাতাল তৈরি করা যেত। কেনা যেত সাত লক্ষ আইসিইউ-ভেন্টিলেটর,  ১৩ লক্ষ পোর্টেবল ভেন্টিলেটর এবং অসংখ্য অক্সিজেন প্লান্ট তৈরী করা যেত । মূল ভবনটি নির্মাণে খরচ ৯৭১ কোটি টাকা যেখানে ২০০ কোটি টাকায় ১৬০টি অক্সিজেন প্লান্ট বানানো যায় অর্থাৎ ৯৭১ কোটি টাকায় প্রায় ৭৭৭ টির মত অক্সিজেন প্লান্ট বানানো যাবে। অর্থাৎ বহু সংখ্যক মানুষের প্রাণ বাঁচানো যেত এই পরিস্থিতিতে।

কিন্তু সেই অক্সিজেন প্লান্ট দেখে তো আর বিদেশ সফরে আসা মন্ত্রীদের “এসে হীরক দেশে , দেখে হীরের চমক” এ গান গাওয়া যাবে না। তাহলে কিই বা লাভ?  যেখানে ভারতবর্ষের দৈনিক করোনা সংক্রমনের সংখ্যা দু’লক্ষের ওপরে সেখানে এই প্রকল্পটি  ‘ অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার’ আওতায় পড়ে। দৈনিক তিনটি শিফটে চালানো হচ্ছে নির্মাণ কাজ এবং কারফিউর মধ্যেও ১৮০ টি গাড়ি চলাচলের অনুমতি মিলেছে এই কাজের জন্য। কারণ মোদি সরকার ২০২৪ এর মধ্যে এই প্রকল্পটি শেষ করতে চায় তাই কোনভাবেই কাজের গাফিলতি চলবে না। লোকসভা রাজ্যসভা তে আইন পাস ও নির্বাচনের জন্য স্মার্ট ডিসপ্লে এবং বায়োমেট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করা হবে।  মজার বিষয় হল পেপারলেস এই পার্লামেন্ট তৈরীর ক্ষেত্রে জন্য ওই এলাকার মোটামুটি ২০০ প্রাচীন গাছ এবং চার হাজারেরও বেশি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে । যদিও সরকারের তরফে বলা হয়েছে এই প্রাচীন গাছের কিছু উপড়ে নিয়ে অন্যত্র পুঁতে দেওয়ার কথা।

 এবার জেনে নেওয়া যাক এই কুড়ি হাজার কোটি টাকায় আসলে তৈরি হচ্ছেটা কি।

তৈরি হচ্ছে একটি নতুন পার্লামেন্ট বিল্ডিং যার জন্য মোটামুটি ৯৭১ কোটি টাকা খরচ বরাদ্দ হয়েছে । থাকবে একটি সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং । প্রধানমন্ত্রী একটি নতুন বাসস্থান ও  একটি নতুন অফিস । ভাইস প্রেসিডেন্টের থাকার জন্য একটি মহল  এবং আরো কিছু বিলাসবহুল চমক। পার্লামেন্টের পুরনো ভবনের পাশেই তৈরি হবে নতুন বিল্ডিংটি , যা হবে ত্রিকোণাকৃতি এবং চার তলা। ভূমিকম্প প্রুফ  এই পার্লামেন্টে রাজ্যসভা ও লোকসভার মিলিয়ে মোট ৯০০ থেকে ১২০০ জন সংসদ বসতে পারবেন। ইন্টেরিয়ার এর থিমে থাকবে মূলত তিনটি জাতীয় প্রতীক। লোকসভার চেম্বার জাতীয় পাখি ময়ূর,  রাজ্যসভা চেম্বার জাতীয় ফুল পদ্ম এবং সেন্ট্রাল লাউঞ্জের থিম জাতীয় বৃক্ষ বট এর অনুকরণে হবে। পুরো বিল্ডিংটি ঘিরে রাখা হবে এ আই নির্ভর সিকিউরিটি সিস্টেমে। এবং নতুন ধরনের অডিও ভিসুয়াল কমিউনিকেশন সিস্টেম ইন্সটল করা হবে। পেপারলেস পার্লামেন্ট করার জন্য প্রায় সব কিছুকেই ডিজিটালাইজড করা হবে। একটি সেপারেট ভিআইপি লাউঞ্জ তৈরি করা হবে এবং সমস্ত এমপির জন্য প্রমাণ সাইজের অফিস স্পেস থাকবে। এই ছিল মোটামুটি ইন্টেরিয়ার প্ল্যান। সম্পূর্ণ প্রজেক্টটি তৈরি করার বরাত পেয়েছে যে নির্মাণ সংস্থা তারা এর আগে গুজরাটের সবরমতী রিভার ফ্রন্ট, কাশী বিশ্বনাথ করিডোর, গুজরাটের সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট তৈরীর বরাত পেয়েছিল।  তাই এই নিয়েও বিরোধীরা ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলছে।

কিন্তু সে সব কিছুতেই পাত্তা না দিয়েই কাজ কাজের মতই এগিয়ে চলেছে কারণ ২০২৪ এর মধ্যে এই প্রজেক্ট শেষ করায় বদ্ধপরিকর মোদি সরকার।

ইতালির একজন দেশ নায়ক এর সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত আছে যে তিনি নিজে ইতালিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হলেও তিনি তখন নির্দেশ দিয়েছিলেন যে ইতালিতে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।  অর্থাৎ এর মাধ্যমে তিনি ইতালির দেশবাসীর মনের মধ্যে একটা বিশ্বাস তৈরি করতে চেয়ে ছিলেন যে দেশের যে কোনো অবস্থাতে দেশ ও মানুষের সব রকম সুবিধার পরিকাঠামো সঠিক রাখার দায়িত্ব তিনি বহাল রেখেছেন। এই পরিকল্পনার পিছনে যে অতি সুকৌশলী কারণটি ছিল তা হল পরবর্তী ক্ষেত্রে যুদ্ধে রাষ্ট্রের খরচা এবং জনসেবায় রাষ্ট্রের ব্যয়ের হিসাব সম্পর্কে যেন মানুষের মনে কোন প্রশ্ন না জাগে।

এই পরিকল্পনার সাথে সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পের মিল মিল খুঁজে পাওয়ার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।

 স্বাধীনতার 75 বছর পূর্তির জাতীয় গৌরব ফলকের নির্মাণে ভাঙ্গা পড়তে চলেছে ভারতের তিনটি গৌরবময় বিল্ডিং যথাক্রমে দিল্লি ন্যাশনাল মিউজিয়াম,  ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্টস এবং ন্যাশনাল আর্কাইভ এন্ড বিল্ডিং। যদিও ভারত সরকার বলেছেন কোনো চিন্তা নেই কারণ তারা বর্তমান পার্লামেন্ট একটি মিউজিয়াম তৈরি করে দেবেন। হেরিটেজ বিল্ডিং ভেঙে গৌরব ফলক নির্মাণ হয়তো পৃথিবীতে এই প্রথম।

দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা। কবরস্থান,  শ্মশান সব জায়গাতেই জমা হয়েছে অসংখ্য মৃতদেহ।  উত্তরপ্রদেশের গঙ্গাবক্ষ ভরে উঠেছে মৃতদেহের স্তূপে।  তবুও একদিনের জন্য থেমে নেই এই সেন্ট্রাল ভিস্টা প্রকল্পের কাজ ।

আশা রাখি এই হাজারো মৃতদেহের স্তুপ এর মাঝেও এই জাতীয় গৌরব ফলক তার নির্মাণের গৌরবান্বিত কাহিনী নিয়ে একদিন ঠিক মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।

পারবে তো ?

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *