হুল উৎসব থেকে তির-ধনুক নিয়ে হামলা, তিরবিদ্ধ উপ-প্রধানের ভাই, শালবনি কোবরা ক্যাম্পে জওয়ানের আত্মহত্যা, করোনায় মৃতদের পরিবারকে দিতে হবে ক্ষতিপূরণ, কেন্দ্রকে নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের, কসবা কাণ্ডে অভিযুক্ত দেবাঞ্জন দেবকে মনোরোগী বলে দাবি করলেন আইনজীবী, বালি তোলা সহ নানা সমস্যার সমাধান করতে হবে বৈঠকে বললেন মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া, পরিত্যক্ত পিপিই কিট পরে শহরের রাস্তায় ঘুরছে মানসিক ভারসাম্যহীন, আতঙ্ক মেদিনীপুরে, জনপ্রিয় অভিনেতা বর্তমানে মাছ ব্যবসায়ী, হলফনামা জমা দেবার ক্ষেত্রে জরিমানা দিতে হল পাঁচ হাজার টাকা, আজ ঘোষণা হতে পারে নারদ মামলার রায়, বুধবার থেকে পনেরো শতাংশ ভাড়া বাড়ছে ওলা উবেরের,

Latest Trending Online News Portal : Bongobani.com

Sports News District News National News Updates

দেশ সাহিত্য ও বিনোদন

মেঘের আড়ালে কবি শঙ্খ ঘোষ

শৌর্যা মুখোপাধ্যায়

নিজেই বেঁধে বেঁধে থাকার কথা বলে পাড়ি দিলেন অচিনপুরের না ফেরা জগতে। একটা যুগের অবসান। কবিতার জগতের নক্ষত্রপতন।   করোনার করাল থাবায় প্রাণ হারালেন ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘জ্ঞানপীঠ’ প্রাপক শঙ্খ ঘোষ। মাত্র ৮৯ বছর বয়সে চলে গেলেন কবি। বাংলার সাহিত্যজগত কার্যত অভিভাবকহীন হল। রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাসের উত্তরসূরি ছিলেন কবি। আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। পিতা মনীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মা অমলা ঘোষ। বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদপুরে জেলায় ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। কবি বড় হয়েছেন পাবনায়। বাবার চাকরির জন্যই বেশ কিছুদিন ছিলেন পাবনায়। সেখানে থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তাঁর স্কুলের নাম ছিল চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ।  

পরবর্তী দিনে চলে আসেন এ রাজ্যে। ১৯৫১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক ও পরবর্তী সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর হন তিনি। পড়াশুনা শেষে বঙ্গবাসী কলেজ, সেখান থেকে সিটি কলেজে শিক্ষকতা করেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘদিন। ১৯৯২ সালে অবসর নেন চিরতরুণ এই কবি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ এখনও মানুষকে ছুঁয়ে যায়।

শঙ্খ ঘোষ ছিলেন সেই কবি, যিনি সমাজ-সচেতনার জন্যও কলম ধরেছেন। প্রতিবাদে মিছিলে হেঁটেছেন। স্বল্পভাষায় ও লেখায় জানিয়েছেন তাঁর প্রতিবাদ। যা গোটা সমাজ কে প্রভাবিত করেছিল। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় থেকেই কবি সরব। একইভাবে যখন এ রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে বিরোধীরা সরব হয়েছে তখনও তাঁর কলম থেমে ছিল না।  ‘মুক্ত গণতন্ত্র’ নামের  কবিতায় শঙ্খ ঘোষ লিখলেন :

যথার্থ এই বীরভূমি-
উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে এসে
পেয়েছি শেষ তীরভূমি।
দেখ্ খুলে তোর তিন নয়ন
রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে
দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন।

এই কবিতা প্রকাশের পরেই ঝড়ের গতি গোটা বাংলার মানুষের হাতে পৌঁছে গেল কবির প্রতিবাদ। কবির সমালোচনায় সরব হলে বীরভূমের তৃণমূল নেতা  অনুব্রত মন্ডল। শঙ্খ ঘোষকে আক্রমণ করতে গিয়ে শালীনতার বাঁধ ভেঙে সেদিন অনুব্রত মন্ডল মাইক হাতে বলে উঠেছিলেন, ‘এ কোন নতুন কবি উঠে এসেছেন, যে আমাদের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছেন।’ এখানে না থেকে জ্ঞানপীঠ প্রাপক শঙ্খ ঘোষকে উদ্দেশ্যে করে আরও বলেছিলেন তিনি, ‘শঙ্খ একটা ভাল জিনিস, সব পবিত্র কাজে লাগে। শঙ্খ ভুল করলে দেবতার অসম্মান হয়। সেই কারণেই ওঁর নাম শঙ্খ রাখা উচিত হয়নি।’

করোনার গ্রাসে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া কবির কথা শুনে মন ভার আজ অনুব্রতও। তিনি বললেন, ‘সেদিন যে প্রসঙ্গেই বলে থাকি, সেব অতীত। উনি ভালো মানুষ। ওনার আত্মার শান্তি কামনা করি।’ বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী জগন্নাথ বসু বলন, ‘মন ভালো নেই। ওনার কাছে আমি রক্তকরবি পড়ার জন্য গিয়েছিলাম। এখনও মনে পড়ে ‘ঝুলন’ কবিতাটি আমাকে শিখিয়েছিলেন। ওনার এই অনুচ্চ কন্ঠটি আমাকে টানত বেশী করে। শম্ভু মিত্রের সঙ্গে ওনার অনেক জায়গায় আমরা মিল খুঁজে পাই।’ আরও এক বাচিক শিল্পী জয়ন্ত ঘোষ বলেন, ‘যাঃ! আর তো কেউ রইল না। আমাদের প্রিয় কবি  শব্দহীন হলেন। আবৃত্তি শিল্পী সংস্থার সমস্ত পরিবার আমরা শোকাহত। এখন মনে হচ্ছে ‘বিদায়রথের ধ্বনি / দূর হতে ওই আসে কানে।/ ছিন্নবন্ধনের শুধু/ কোনো শব্দ নাই কোনোখানে।’

১৪ তারিখে করোনার রিপোর্ট পজেটিভ আসে কবির। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি হাসপাতালে যেতে চাননি। বাড়ি থেকেই চলছিল তাঁর চিকিৎসা। আজ সকাল ৮টা নাগাদ আচমকাই তাঁর অক্সিজেন রেট কমে যায় শরীরের। এরপরে চিকিৎসকরাও এসেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। অনারম্বরভাবেই চেয়েছিলেন তিনি চলে যেতে। পরিবারের লোকেরা তাঁর শেষ সে ইচ্ছাকেই সম্মান জানিয়ে নীরবেই বিদায় দিলেন কবিকে। রাজ্যের পক্ষ থেকে গান স্যালুট দেবার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।  ‘এমন একটা সময়ে শঙ্খ ঘোষ চলে গেলেন, যখন তাঁর মতন মানুষকে আরও বেশী করে আমাদের প্রয়োজন ছিল।’ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে এমনই মন্তব্য করলেন ববি হাকিম।

শান্ত, আপত নিরীহ কবি খুব কোলাহল পছন্দ করতেন না। একেবারে নিজের লেখালিখির সঙ্গেই জড়িয়ে থাকতে বেশী পছন্দ করতেন। তবে সমাজ থেকে রাজনীতি সবেতেই ছিল তাঁর তীক্ষ্ণ নজরদারি। কখনও প্রতিবাদ করেছেন লিখে, কখনো হেঁটেছেন নিজের মতন করে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে কেউ কোন কথা বললে পাল্টা জবাব দেননি তিনি। আজও তাঁই তার শেষ দিনে বাড়ির সামনে অসংখ্য গুনরাগী, চোখের জলে দূর থেকে দেখছেন তাঁদের প্রিয় কবিকে। কবি যে তখন মেঘের আড়ালে চলে গেছেন। দূর থেকেই দেখছেন তাঁর সেই ভালোবাসার মানুষজনকে। তাঁর লেখার ঘরটাকে। ‘আড়ালে’ কবিতায় কবিতো এমন রুক্ষ এক দুপুর কে নিয়ে লিখেছিলেন :

দুপুরে রুক্ষ গাছের পাতার
কোমলতাগুলি হারালে-
তোমাকে বকব, ভীষণ বকব
আড়ালে ।
যখন যা চাই তখুনি তা চাই ।
তা যদি না হবে তাহলে বাঁচাই
মিথ্যে, আমার সকল আশায়
নিয়মেরা যদি নিয়ম শাসায়
দগ্ধ হাওয়ার কৃপণ আঙুলে-
তাহলে শুকনো জীবনের মূলে
বিশ্বাস নেই, সে জীবন ছাই!
মেঘের কোমল করুণ দুপুর
সূর্যে আঙুল বাড়ালে-
তোমাকে বকব, ভীষণ বকব
আড়ালে ।।

না ফেরার জগতে ভালো থাকুন কবি, আপনার মতন করে।
শুধু যখন  আমরা একে অপরের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে তুলব, তখন যেন মনে করিয়ে দেবেন :

আমাদের ডান পাশে ধ্বস 
আমাদের বাঁয়ে গিরিখাদ 
আমাদের মাথায় বোমারু 
পায়ে পায়ে হিমানীর বাঁধ 
আমাদের পথ নেই কোনো 
আমাদের ঘর গেছে উড়ে 
আমাদের শিশুদের শব 
ছড়ানো রয়েছে কাছে দূরে ! 
আমরাও তবে এইভাবে
এ-মুহূর্তে মরে যাব না কি ? 
আমাদের পথ নেই আর
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি ।

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *