হুল উৎসব থেকে তির-ধনুক নিয়ে হামলা, তিরবিদ্ধ উপ-প্রধানের ভাই, শালবনি কোবরা ক্যাম্পে জওয়ানের আত্মহত্যা, করোনায় মৃতদের পরিবারকে দিতে হবে ক্ষতিপূরণ, কেন্দ্রকে নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের, কসবা কাণ্ডে অভিযুক্ত দেবাঞ্জন দেবকে মনোরোগী বলে দাবি করলেন আইনজীবী, বালি তোলা সহ নানা সমস্যার সমাধান করতে হবে বৈঠকে বললেন মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া, পরিত্যক্ত পিপিই কিট পরে শহরের রাস্তায় ঘুরছে মানসিক ভারসাম্যহীন, আতঙ্ক মেদিনীপুরে, জনপ্রিয় অভিনেতা বর্তমানে মাছ ব্যবসায়ী, হলফনামা জমা দেবার ক্ষেত্রে জরিমানা দিতে হল পাঁচ হাজার টাকা, আজ ঘোষণা হতে পারে নারদ মামলার রায়, বুধবার থেকে পনেরো শতাংশ ভাড়া বাড়ছে ওলা উবেরের,

Latest Trending Online News Portal : Bongobani.com

Sports News District News National News Updates

মতামত লেখকের

অতীতক্ষয়ী ভবিষ্যত : প্রসঙ্গ সুন্দরবন (১)

সুজন ভট্টাচার্য

প্রাক-কথন

আম ফ্যান আর যশ ঘূর্ণিঝড়ের পরে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্ভুক্ত সুন্দরবন অঞ্চলে লাগাতার ত্রাণ কর্মসূচী চালাতে গিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষের সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে। তাদের দেওয়া সূত্র ধরেই ত্রাণের পরিকল্পনা করি, আবার তাদের সঙ্গেই লড়ে যাই মাঠেময়দানে, নদীর ভেঙে যাওয়া বাধের উপরে কিংবা জলমগ্ন চাষের জমিতে। ন্যাজাটের বাবুয়া, রবি আর তপন দেব, মামুদপুরের খুশি ইসলাম আর হালিমা, সেহারার দীপঙ্কর, হিঙ্গলগঞ্জের প্রবীর মণ্ডল কিংবা হাসান গাজী আর নজরুল, কালীনগরের দিব্যেন্দু আর অমলেন্দু, সুলকুনির মিঠুন দাদার নেতৃত্বাধীন কিশোরবাহিনী। এদের কেউ ডাকে কাকু, কেউ দাদা, আর কেউ বা সামান্য ভদ্রতা করে স্যার। ইদানিং কালে এরাই দিনের পর দিন দাবী করে যাচ্ছে, সাহিত্য অনেক হয়েছে; এবারে সুন্দরবনকে বাঁচানোর জন্য কিছু লিখুন। ত্রাণ নিতে নিতে মানুষগুলো জাত-ভিখিরি বনে যাচ্ছে।সুষ্ঠু পরিকল্পনার কথা লিখুন, যাতে সুন্দরবনের বাসিন্দারা মানুষ হয়ে বাঁচতে পারে। সেই দাবীকে সম্মান জানিয়েই এই ধারাবাহিক আলোচনার সূত্রপাত।

বিপর্যয়ের মহাভারত

২০২০। আম ফানের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে সুন্দরবন। স্বভাবতই আমরাও গিয়েছি ত্রাণে। তারই একদিনের ঘটনা। হাসনাবাদ থেকে নৌকায় চেপে কালিন্দী নদী বরাবর গন্তব্য সুলকুনির বিভিন্ন পাড়া। একসময়ে এল জোয়ার। জল বাড়তে বাড়তে নদীর পাড়ের হাতদুয়েক নিচে চলে এল। ফলে আর নৌকা থেকে নেমে প্যাকেট বিলি সম্ভব নয়। বাধবাসীরা চার পা নেমে এগিয়ে আসছেন নৌকার দিকে। আমরা নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়েই প্যাকেট এগিয়ে দিচ্ছি। একটি বাচ্চা মেয়ে বোধহয় খানিক দেরি করে ফেলেছিল। দৌড় লাগাল নৌকার দিকে। কাছাকাছি এসেই হড়কে গেল পা। উলটে পড়ল কাদার বুকে। সর্বাঙ্গে কাদা, পরনের শতচ্ছিন্ন ফ্রকটাও ল্যাপাপোচা কাদায়। আতঙ্কে আমরা চিৎকার করে উঠলাম। উঠে পড়ল মেয়েটি। আর তারপর ভাবলেশহীন মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল লাইনে। পরিস্কার বুঝলাম, বছরের পর বছর বিপর্যয়ের ধাক্কায় সুন্দরবনের বাচ্চারাও এখন এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। ঝড় আসবেই, আসবেই বান; ভেবে লাভ নেই। ত্রাণের লাইনটাই তাদের কাছে তাই বেঁচে থাকার আসল রসদ।     

ধ্বংসের এককণা । ছবি – প্রতিবেদক

বৃদ্ধের বয়স ৬৩ বছর। নাম অলক কুমার জানা। ‘আর বোধহয় থাকা যাবে না’, বিড়বিড় করছিলেন বৃদ্ধ। ‘নিজের জীবদ্দশাতেই বিশ একর জমি চলে গেল’। না, কোনো অপারেশন বর্গা বা ভূমি সংস্কার কর্মসূচী নয়, অলকবাবুর জমি খেয়ে নিয়েছে জল। একের পর এক সাইক্লোন এসেছে, এসেছে বান। আর লোনা জল ডুবিয়ে দিয়েছে জমি। সাইক্লোন যশের হাত ধরে উঠে আসা জলস্ফীতি এবারও ভাসিয়ে নিয়েছে তার ঘর আর অবশিষ্ট ৩ একর ক্ষেত। চাষবাস অন্তত বছরদুয়েক হবে না। তার পর কি এই ঘোড়ামারা দ্বীপটাও টিকে থাকবে? প্রশ্নটা সঙ্গত। কারণ তিন দশক আগেও যে দ্বীপটির বিস্তৃতি ছিল ২৬ বর্গ কিমি, আজ তার পরিমাপ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৭ বর্গ কিমি। আশঙ্কা করা হচ্ছে সাম্প্রতিক জলস্ফীতির পরে সেই পরিমাণ আরো কমে ৩ বর্গ কিমির আশপাশে দাঁড়াবে।

       ঘোড়ামারা আর সাগর প্রায় যমজ দুই দ্বীপ। সাগর দ্বীপের দক্ষিণের হানাদারি বঙ্গোপসাগরের হাতে। ঘোড়ামারার চারদিকে হুগলী নদীর পাহারা।পূর্বে কাকদ্বীপ আর পশ্চিমে নন্দীগ্রাম আন্দোলনখ্যাত নয়াচর। ‘ছোটবেলায় ভাটার টাইমে সাঁতরে সাগরে চলে যেতাম, কয়েক মিনিটেই’, ফ্লাড শেল্টারে বসে বলছিলেন কয়েকজন বৃদ্ধ। আর আজ নিদেনপক্ষে ৪০ মিনিট সময় লাগে নৌকায় যেতে। দ্রুত মাটি খেয়ে নিচ্ছে জল। আর ক্রমশ ঘরের কাছে এগিয়ে আসছে নদী। ১৯৮০-র দশকেই জলের নিচে ডুব দিয়েছে বেডফোর্ড, লোহাচরা, দক্ষিণ তালপট্টি আর কাবাসগড়ি দ্বীপ। এদের মধ্যে অবশ্য কেবলমাত্র লোহাচরাতেই ৬০০০ মানুষের বসতি ছিল। আজ তারা নানা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। দ্রুত ক্ষয় পাচ্ছে মৌসুনি দ্বীপও। গোটা সুন্দরবন অঞ্চলটাই আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশঙ্কায় দিন গুনছে। প্রতিবছর সাইক্লোন, জলস্ফীতি আর ভূমিক্ষয়ের সূত্রে ক্রমশ মুছে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে। এর পিছনে প্রকৃতির ভূমিকাই তো নিঃসন্দেহে সবথেকে বড়। কিন্তু মানুষের ভূমিকা? সেই আলোচনায় ঢোকার আগে আসুন, সুন্দরবনের ভূগোলটা একবার দেখে নেওয়া যাক।

সুন্দরবনঃ সভ্যতার চাপ

ভূগোলের হিসাবে সুন্দরবনের বিস্তৃতি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার বঙ্গোপসাগরের বুকে এলিয়ে পড়া মোহানা অঞ্চলজুড়ে। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী নদী থেকে বাংলাদেশের খুলনা জেলার বালেশ্বর নদী পর্যন্ত। হিমালয় থেকে বয়ে আসা পলি এখানে ক্রমাগত সঞ্চিত হয়। জোয়ারের জলের ক্রমাগত ধাক্কার কারণে এখানকার মাটি খুব দৃঢ় নয়। মাটিতে লবণের ভাগ বেশি। সুন্দরবনের মাটি চরিত্রগতভাবে দোআঁশ। তবে স্থানভেদে কোথাও বালি, কোথাও পলি আর কোথাও কাদার ভাগ বেশি। মাটির গড়ন মাঝারি, অর্থাৎ বালি ও পলির ভাগ প্রায় সমান। সুন্দরবন নামটাই এসেছে সুন্দরী গাছের বন থেকে। সুন্দরী গাছ ম্যানগ্রোভ গাছ বলেই পরিচিত। তবে সুন্দরী একমাত্র ম্যানগ্রোভ নয়। সুন্দরবনেই সুন্দরী ছাড়াও কেওরা, গরান, গেওয়া, বান ইত্যাদি প্রজাতির ম্যানগ্রোভ পাওয়া যায়। সমুদ্রের তীরে যেখানে জোয়ারভাটায় জলস্তর অনেকটাই ওঠানামা করে, সেই লবণাক্ত জলে স্বচ্ছন্দে শিকড় বেছাতে পারে ম্যানগ্রোভ। সাধারণভাবে পূর্ণবয়স্ক সুন্দরী গাছ ৭৫ ফুট অবধি লম্বা হতে পারে। গরান বা গেওয়ার উচ্চতা আবার ১০-১২ ফুট হয়।  কিন্তু শিকড় মাটির অনেক নিচে এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকে। আর এদের বীজ ফলের মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে যায়। ফল ফেটে গেলে মাটিতে আর বীজ পড়ে না, নতুন প্রজন্মের গাছ সরাসরি মাটিতে গেঁথে যায়। 

ধ্বংসের স্মৃতি ছড়িয়ে এভাবেই। – ছবি – প্রতিবেদক

১৮২৯ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনের বিস্তৃতি ছিল ১৬,৭০০ বর্গ কিমি। বর্তমানে অবশ্য ১০,০০০ বর্গ কিমি পরিমিত স্থানকেই সুন্দরবন বলে ধরা হয়। তবে এর মধ্যে প্রকৃত বনভূমির বহর বর্তমানে ৪৪১০ বর্গ কিমি যার মধ্যে জলাভূমিই হল ১৭০০ বর্গ কিমি। অর্থাৎ ২০০ বছরে সুন্দরবনের সংকোচন হয়েছে ৪০.১২ শতাংশ। এর পিছনে প্রকৃতির খেলা অবশ্যই আছে।কিন্তু মানুষের ভূমিকা কি আদৌ আছে? দেখাই যাক। যদি প্রশ্ন করি, কলকাতার দুই মহাশ্মশানের নাম কী, সবাই বলবেন নিমতলা আর ক্যাওরাতলা। বোঝাই যাচ্ছে, ক্যাওরাতলায় আসলে ক্যাওরা গাছের জঙ্গল ছিল। ক্যাওরা হল কেওরা শব্দেরই চলতি ডাক। তার মানে দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট মন্দিরের কাছে সেই শ্মশান অঞ্চলে আগে কেওরা গাছের বন ছিল, অর্থাৎ ম্যানগ্রোভ।তাহলে তো কালীঘাট অঞ্চল একদা সুন্দরবনেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইংরেজ আমলের প্রথমদিকে নাকি বর্তমানে চৌরঙ্গী অঞ্চলে বাঘের দেখা মিলত। তার মানে কলকাতার ইউরোপিয়ান অঞ্চলও ছিল সুন্দরবনের মধ্যেই। কোথায় গেল সেই সুন্দরবন?

ইয়াস এর চিহ্ন। ছবি – প্রতিবেদক

বর্তমানে সুন্দরবনের ৬২% বাংলাদেশে আর ৩৮% পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দুই চব্বিশ পরগনা জেলাতেই সুন্দরবনের অস্তিত্ব। উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়া, মিনাখাঁ, হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জ আর সন্দেশখালি ১ ও ২ নং ব্লক সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্ত। আর দক্ষিণের ক্ষেত্রে সাগর, নামখানা, কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা, কুলতলী, মথুরাপুর ১ ও ২, জয়নগর ২, ক্যানিং ১ ও ২, বাসন্তী আর গোসাবা ব্লক সুন্দরবনের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু মানচিত্রের আলোচনাটা এখানেই সীমাবদ্ধ রাখলে বাস্তব ছবিটা বোঝা যাবে না। উত্তর ২৪ পরগনায় সুন্দরবনের উত্তরতম প্রান্ত হল হাসনাবাদে কালিন্দী ও ইছামতীর সঙ্গম। সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরের সমান্তরাল করে হুগলী নদী পর্যন্ত যদি একটা রেখা টানা, তাহলে সেটা কলকাতার প্রাণ ময়দানের উপর দিয়েই যাবে। মানচিত্রটি দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। চৌরঙ্গীতে বাঘ পড়ার প্রসঙ্গের ব্যাখ্যাটা পাওয়া গেল? ডায়মন্ড হারবার আর আলিপুর সহ গোটা দক্ষিণ ২৪ পরগনাই থেকে যাবে সেই রেখার অনেক নিচে। ভাঙর, রায়চক, ফলতা আর বারুইপুর, কিচ্ছু বাদ যাবে না। মাটির গড়ন বিচার করলে অবশ্য সেটাই বোঝা যায়। সেই আদি সুন্দরবন তাহলে এভাবেই মানুষের বনে পরিণত হয়েছে।

ক্রমশ

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *